Wednesday, February 28, 2024

দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশায় ৫০০ মোটরসাইকেল চুরি

তারিখ:

দ্রুত বড়লোক হওয়ার নেশায় এক ধনী ব্যবসায়ীর মেয়েকে পটিয়ে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করেন। কিন্তু মেয়ের বাবা-মা তাদের মেয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করলে হতাশ হয়ে পড়েন যুবক। বড়লোক হওয়ার নেশা তখনও কাটেনি। আর এ জন্য শেষমেশ গাড়িচোর চক্রে যোগ দেন সজল নামে এক যুবক। ৫০০ মোটরসাইকেল চুরির পর এই চক্রের পাঁচজন পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে।

বুধবার (১৭ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডের ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার ও গোয়েন্দা (ডিবি) প্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ।

ডিবিপ্রধান বলেন, যারা চুরি করে এবং যারা চোরাই জিনিস কিনে ব্যবহার করবেন উভয়েই সমান অপরাধী। যার কাছে চোরাই জিনিস পাওয়া যাবে, তাকেও আইনের আওতায় আনা হবে।

সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ জানায়, ঢাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে মুন্সীগঞ্জ, নবাবগঞ্জ ও দোহারসহ আশপাশের এলাকায় নিয়ে বিক্রি করে এই চক্রটি। তারা তিন-চার লাখ টাকার মোটরসাইকেল কম দামে বিক্রি করে দেয়।

মঙ্গলবার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর শনির আখড়া ও ধলপুর এলাকায় অভিযান চালিয়ে চোর চক্রের মূল হোতাসহ পাঁচ সদস্যকে গ্রেফতার করেছে ডিবির ওয়ারী বিভাগ। গ্রেফতার ব্যক্তিরা হলেন: নূর মোহাম্মদ (২৬), সজল (১৮), মনির (২২), আকাশ (২২) ও রবিন (২৩)। এ সময় তাদের কাছ থেকে ১৩টি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে একটি পিলসার, একটি অ্যাপাসি আরটাআর ও ১১টি সুজুকি জিক্সার।

যখনই চুরি হোক না কেন, থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করার পরামর্শ দেন ডিবিপ্রধান মোহাম্মদ হারুন অর রশিদ। তিনি বলেন, পরে জিডি কপি ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা শাখায় পৌঁছলে চোরাই গাড়িসহ সব কিছু উদ্ধার করতে সহজ হয়।

হারুন জানান, গ্রেফতার চক্রটি এমন চাবি ব্যবহার করে, তারা যেকোনো মোটরসাইকেল চালু করতে পারে। তবে তারা সুজুকি জিক্সার গাড়ি বেশি চুরি করতে পারে। ঢাকা মহানগরে এলাকাভেদে ভিন্ন ভিন্ন চোর চক্র সক্রিয় রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে গোয়েন্দা পুলিশ কাজ করছে বলে জানান তিনি।

পুলিশ জানায়, গ্রেফতার সজল, মনির ও আকাশের মূল কাজ ছিল দোহার ও আশপাশের এলাকা থেকে চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির জন্য ক্রেতা খুঁজে বের করা। প্রতিটি চোরাই মোটরসাইকেল তারা ৪০ থেকে ৮০ হাজার টাকায় বিক্রি করত। বিক্রির টাকা নূর মোহাম্মদ ৪০ শতাংশ, রবিন ৩০ শতাংশ ও অবশিষ্ট টাকা অন্যরা নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিতেন।

গ্রেফতার আসামিরা জানান, তারা এ পর্যন্ত ৫০০টিরও বেশি মোটরসাইকেল চুরি করেছেন। তারা ২০১৫ সাল থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছেন।

ডিএমপির ওয়ারী ও গেণ্ডারিয়া থানার দুটি চুরির মামলা তদন্তকালে সিসিটিভি ফুটেজ পর্যালোচনা করতে গিয়ে তথ্য-প্রযুক্তির সহায়তায় চোর চক্রকে গ্রেফতার করেছে গোয়েন্দা (ওয়ারী) বিভাগ।

পুলিশের ভাষ্য, জিজ্ঞাসাবাদে আসামিরা জানিয়েছেন তারা ঢাকা মহানগর এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছিলেন। চোর চক্রের মূল হোতা নূর মোহাম্মদ মূলত জুরাইন এলাকায় একটি কাঠের দোকানে নকশার কাজ করতেন। পরে একদিন হাসনাবাদ গলির ভেতর চা দোকানে গ্রেফতার রবিনের সঙ্গে পরিচয় হয়। দুজন মিলে পরিকল্পনা করেন কীভাবে দ্রুত বড়লোক হওয়া যায়।

নূর মোহাম্মদ রবিনকে বলেন, তার কাছে করাত ধার দেয়ার রেদ আছে, যা দিয়ে মোটরসাইকেলের চাবি পাতলা করে ‘মাস্টার কি’ বানানো যাবে। ওই পরিকল্পনা অনুযায়ী রবিনের জিক্সার মোটরসাইকেলের চাবি রেদ দিয়ে ঘষে পাতলা করে শারিঘাট, হাসনাবাদ, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জে পার্ক করা একটি জিক্সার মোটরসাইকেল চুরি করার উদ্দেশ্যে প্রথমে পরীক্ষামূলক চেষ্টা করেন। পরে মোটরসাইকেলটি স্টার্ট হয়ে গেলে তারা মোটরসাইকেলটি চুরি করে নিয়ে যান। এরপর থেকে তারা এ চাবিকেই ‘মাস্টার কি’ হিসেবে ব্যবহার করে দুই বন্ধু দীর্ঘদিন ধরে মোটরসাইকেল চুরি করে আসছেন।

চোরাই মোটরসাইকেল বিক্রির জন্য তারা দোহারে সজলকে তাদের চক্রের সদস্য হিসেবে যুক্ত করেন। ঢাকা মহানগর এলাকা থেকে মোটরসাইকেল চুরি করে নিরাপদ রোড হিসেবে পোস্তগোলা ব্রিজ পার হয়ে মাওয়া রোডের শ্রীনগর বাইপাস হয়ে মেঘুলা বাজার, দোহার রুট হিসেবে ব্যবহার করেন।

অন্যদিকে বাবুবাজার ব্রিজ পার হয়ে কেরানীগঞ্জ, জয়পাড়া ও দোহার এলাকা যাওয়ার রুট হিসেবে ব্যবহার করেন। সজল ও মনির দোহারের বিভিন্ন এলাকার সাধারণ মানুষের কাছে চোরাই মোটরসাইকেল ইন্ডিয়ান বর্ডার ক্রস গাড়ি বলে বিক্রি করে আসছিলেন।

সজল জানান, তিনি নিজেও বড়লোক হওয়ার নেশায় দোহারের মেঘুলা বাজারের একজন ধনী বেকারি ব্যবসায়ীর মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে বিয়ে করেন। কিন্তু মেয়ের মা-বাবা তাদের মেয়ের সঙ্গে সজলের সম্পর্ক ছিন্ন করলে সজল হতাশ হয়ে পড়েন। বড়লোক হওয়ার নেশায় আসামি নুর মোহাম্মদ-রবিনদের চক্রে সজলও যোগ দেন।

রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন থানায় গ্রেফতার নুর মোহাম্মদের বিরুদ্ধে চারটি মামলা, রবিনের বিরুদ্ধে তিনটি ও অন্য তিনজনের বিরুদ্ধে একটি করে মামলা আছে।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন ডিএমপির গোয়েন্দা ওয়ারী বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ আশরাফ হোসেন, মিডিয়া মুখপাত্র ফারুক হোসেন, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার তরিকুর রহমান, মিডিয়ার এডিসি হাফিজ আল আসাদ, এসি আবু তালেব ও টিম লিডার মাহফুজুর রহমান।

জনপ্রিয় সংবাদ