Tuesday, February 27, 2024

গুজরাটে বিলকিস গণধর্ষণ মামলায় সব আসামির মুক্তি

তারিখ:

ভারতের গুজরাটে বহুল আলোচিত বিলকিস বানো গণধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন পাওয়া ১১ জন আসামির সবাইকে মুক্তি দেয়া হয়েছে। সোমবার (১৫ আগস্ট) গুজরাটের গোধরা জেল থেকে তাদের ছেড়ে দেয়া হয়। এর আগে শাস্তি মওকুফ চেয়ে আসামিদের একটি আবেদন মঞ্জুর করে রাজ্য সরকার। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যমগুলোতে এ খবর জানানো হয়েছে।

আলোচিত ‘বিলকিস বানো মামলা’য় দোষী সাব্যস্ত হয় তারা। বিলকিস বানোকে গণধর্ষণ ও তার পরিবারের সবাইকে হত্যার দায়ে ২০০৮ সালে দোষী সাব্যস্ত করে তাদের ১৪ বছর করে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এরপর এতদিন গোধরার উপসংশোধনাগারে বন্দি ছিল তারা।

আল জাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০২ সালে গুজরাটে গোধরায় হিন্দু তীর্থযাত্রী বহনকারী একটি ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনার পর মুসলিমবিরোধী গণহত্যার ঘটনা ঘটে। ট্রেনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৫৯ তীর্থযাত্রী নিহত হয়। এর জন্য উগ্র-হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলো স্থানীয় মুসলিমদের দায়ী করে।

আল জাজিরার প্রতিবেদন মতে, এরপর গুজরাটজুড়ে মুসলিমবিরোধী সহিংতা ছড়িয়ে পড়ে। যা গুজরাট দাঙ্গা হিসেবে পরিচিত। যা কয়েকদিন ধরে চলে। এ ঘটনায় প্রায় ২ হাজার মানুষকে (যাদের বেশিরভাগই মুসলিম) গুলি করে ও আগুনে পুড়িয়ে হত্যা করা হয়। শত শত নারীকে ধর্ষণ করা হয়।

ওই সময় ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন। নারকীয় ওই হত্যাযজ্ঞ থামাতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এমনকি পরবর্তীতে ভুক্তভোগীদের পক্ষে লড়াই করা মানবাধিকারকর্মীদের টার্গেট করার অভিযোগ রয়েছে।

মুসলিমবিরোধী সহিংসতা ও হত্যাযজ্ঞের সবচেয়ে ভয়াবহ ঘটনাগুলোর একটি হচ্ছে আলোচিত বিলকিস বানো গণধর্ষণ। সেই সময় পাঁচ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন বিলকিস। এছাড়া সালেহা নামে তিন বছরের একটি মেয়ে ছিল তার।

উগ্র-হিন্দুত্ববাদী গোষ্ঠীগুলোর তাণ্ডব থেকে বাঁচতে ৩ মার্চ সালেহা ও পরিবারের আরও ১৪ সদস্যের সঙ্গে গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছিলেন বিলকিস। দাহোদ জেলার লিমখেদা এলাকায় ধু ধু মাঠে গজিয়ে ওঠা ঝোপের মধ্যে আশ্রয় নেন সবাই।

কিন্তু এরপরও তাদের রেহাই দেয়া হয়নি। স্থানীয় সংবাদমাধ্যম এবিপি আনন্দের তথ্য মতে, কাস্তে, তলোয়ার ও লাঠি নিয়ে সেই মাঠের মধ্যেই তাদের উপর ঝাপিয়ে পড়ে ২০-৩০ জনের একটি দল। গণধর্ষণের শিকার হন বিলকিস।

বিলকিসের চোখের সামনে তার পরিবারের সবাইকেই একে একে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। মাটিতে মাথা থেতলে মারা হয় তিন বছরের মেয়ে সালেহাকে। সে সময় মরার ছলে মাটিয়ে শুয়ে থেকে জীবন বাঁচান বিলকিস।

এ ঘটনার পর দীর্ঘদিন এ নিয়ে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। বিষয়টি নিয়ে মানবাধিকার ও সমাজকর্মীদের তৎপরতায় বিক্ষোভ শুরু হলে ২০০৪ সালে মামলা হয়।

ভারতের সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে মামলাটি তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (সিবিআই)। এ সময় বহুল আলোচিত গণধর্ষণ ও হত্যা মামলাটি ‘বিলকিস বানো মামলা’ হিসেবে পরিচিতি পায়।

গুজরাটের আহমেদাবাদে সিবিআই’র একটি বিশেষ আদালতে শুনানি শুরু হয়। কিন্তু সাক্ষীদের ভয় দেখানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন বিলকিস। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে মামলাটি আহমেদাবাদ থেকে সরিয়ে মহারাষ্ট্রের মুম্বাইয়ে নিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেন সুপ্রিমকোর্ট।

প্রায় চার বছরের তদন্ত ও শুনানি শেষে ২০০৮ সালে সিবিআই বিশেষ আদালত ১৩ জনকে দোষী সাব্যস্ত করেন। এর মধ্যে ১১ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়। এর মধ্যে দু’জন চিকিৎসক ছিলেন।

প্রমাণের অভাবে আরও সাত জনকে ছেড়ে দেয়া হয়। এছাড়া শুনানি চলাকালেই এক জনের মৃত্যু হয়। এরও প্রায় ১৭ বছর পর ২০১৯ সালে বিলকিসকে ৫০ লাখ রুপি ক্ষতিপূরণ দেয়ার ঘোষণা দেন সুপ্রিম কোর্ট।

এরপর মামলা মুম্বাই হাইকোর্ট গড়ায়। সেখানেও আগের সাজাই বহাল রাখা হয়। প্রায় ১৪ বছর পর তাদের সবাইকে মুক্তি দেয়া হলো। এ বিষয়ে সোমবার (১৫ আগস্ট) ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসকে এক সাক্ষাৎকারে রাজ কুমার নামে গুজরাট রাজ্য সরকারের সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, ১৪ বছর সাজাভোগের পর সম্প্রতি ওই ১১ আসামীর পক্ষ থেকে সাজা মওকুফের আবেদন করা হয়। ভারতে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের মেয়াদ সাধারণত ১৪ বছর হয়ে থাকে।

গোধরা জেলের সুজল মায়াত্র জানান, কিছুদিন আগেই একটি কমিটির অধীনে দোষীদের মুক্তি প্রসঙ্গে আলোচনা হয়। সেখানেই বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত হয়। কমিটির সুপারিশ পাঠানো হয় গুজরাট সরকারের কাছে। রোববার সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, দোষীদের মুক্তির সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মুক্তির নির্দেশও দেয়া হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ