Friday, March 1, 2024

চুপাকাবরাঃ এক রহস্যময় রক্তচোষা প্রাণী।

তারিখ:

১৯৯৫ সালের এক বিকেলবেলার ঘটনা। হঠাৎ-ই পুয়ের্তো রিকোর মাঠে-ঘাটে অদ্ভুতভাবে পড়ে থাকতে দেখা মেলে গবাদি পশুর লাশ, যার বেশিরভাগই ছিল ছাগলের মৃতদেহ। তবে এগুলো সাধারণত একটি ছিল না। প্রত্যেকেরই ঘাড় থেকে দেহের সমস্ত রক্ত শুষে নেওয়া হয়েছিল ।ঠিক যেন ভ্যাম্পায়ারের এক অজানা উপস্থিতি। কিন্তু ভ্যাম্পায়ারের কি এতটাই দুর্দিন এলো যে তারা মানুষ ছেড়ে শেষমেষ ছাগলের পাল্লায় পড়লো? না, অশরীরী কাজের জন্য ভ্যাম্পায়ার নয় বরং দোষারোপ করা হয়েছে “চুপাকাবরা” কে।

বিপুলা এ পৃথিবীর সম্পর্কে আমাদের জ্ঞানের পরিধি আহামরি বেশি না। ভু-গোলার্ধের বাইরে বিভিন্ন মহাজাগতিক বস্তু নিয়ে আমাদের জানার আগ্রহ অনেক। কিন্তু এটা বাস্তব সত্য যে, আমরা এখনো অভ্যন্তরীণ পৃথিবীটাকেই পুরোপুরি জানতে পারিনি। এই অজানা পরিচ্ছেদের এই এক অংশ জুড়ে আছে চুপাকাবরা। এই চুপাকাবরা বিষয়ে আছে নানা মুনির নানা মত। কারো মতে এটি এলিয়েনের পোষা প্রাণী। আবার কিছু মানুষ ধারণা করেন এটা নাসার কোনো অজানা গবেষণার ব্যর্থ ফলাফল। অন্যদিকে ষড়যন্ত্র তত্ত্বে বিশ্বাসীরা ধারণা এই প্রাণীটি-ই এইডস এর মূল উৎস। কোথও আবার একে পৌরাণিক কাহিনীর বিগ ফুট হিস্পানিকও দাবি করা হয়।

চুপাকাবরা কী?

কথায় আছে, “বৃক্ষ তোমার নাম কি ফলে পরিচয়।” তেমনি চুপাকাবরার নাম আর কাজের যথেষ্ট মিল আছে। স্প্যানিশ অভিধানে চিপা শব্দের অর্থ চোষা বা শুষে নেয়া আর কাব্রা মানে ছাগল। এদের সন্ধি ঘাটালে চুপাকাবরা অর্থ দাঁড়ায় “ছাগলচোষা”। যা এক্ষেত্রে ছাগলের রক্ত শুষে নেয় এমন কোনো প্রাণীকে নির্দেশ করে। যদিও এ পিশাচ ছাগলের পাশাপাশি গরু, মহিষ কিংবা ভেড়ার রক্ত পান করতেও দ্বিধা করে না।

সর্বপ্রথম চুপাকাবরা দেখা মেলে ১৯৯৫ সালের মার্চে ল্যাটিন আমেরিকার পুয়ের্তো রিকো দ্বীপপুঞ্জে। ঘটনাস্থলে আটটি মতান্তরে পনেরোটি ছাগলের মৃতদেহ পাওয়া যায়, যাদের প্রত্যেকের গলায় কামড়ের কত আর দুটির দাঁতের চিহ্নের দেখা মেলে যেখান থেকে শরীরের সব রক্ত শুষে নেওয়া হয়েছে। এর ঠিক কিছুদিন পরেই আগস্ট মাসে স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শী মেন্ডেলিন তলেন্তিনোর এটি প্রকাশিত হয় প্রাথমিক বর্ণনায় এটি ছিল দ পায়ের কুঁজোপিঠ ওয়ালা, ৪-৫ ফুট লম্বা, লাল চোখা অদ্ভুত-ভয়ঙ্কর এবং একই সাথে কুৎসিত এক জন্তু। এ সময়টাতে প্রায়ই মাঠে-ঘাটে মৃত গবাদিপশুর লাশ পড়ে থাকত। এভাবে প্রায় এক বছর ধরে তান্ডব চালিয়ে দু হাজারের কাছাকাছি প্রাণী হত্যার পর হঠাৎ জন্তুটি গায়েব হয়ে যায়।

পরবর্তীতে ৭-৮ বছর তার কোন দেখা মেলেনি। কিন্তু ২০০৪ সালে সে ফিরে আসে সম্পূর্ণ নতুন বেশে। আগের মতই যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাসের বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকে প্রাণীর মৃতদেহ। কারো দেহে বিন্দুমাত্র রক্ত নেই। তবে এবার গবাদি পশুর সাথে মানুষের হাতে আসে চুপাকাবরার মৃতদেহ, দেখতে সেই দুপায়ের পিশাচ নয়, বরং কুকুরের মত। তৎক্ষণাৎ প্রত্যক্ষ লেখক ও গবেষক বেঞ্জামিন রেডফোর্ড উদ্ধারকৃত প্রাণীদেহে গুলোর উপর গবেষণা শুরু করেন। আধুনিক বিজ্ঞানের কল্যাণে ডিএনএ টেস্ট সহ অন্যান্য ফরেনসিক টেস্ট এর মাধ্যমে জানা যায়, এগুলো কেবলমাত্র কিছু শিয়াল-কুকুর প্রজাতির প্রাণী যারা Sarcoptic Mange নামক চর্ম রোগে ভুগছিল। আর মানুষের নানা জল্পনা-কল্পনা এবং গণমাধ্যম দ্বারা অতিরঞ্জিত হয়ে এরা চুপাকাবরা নামটি পায়। এই সম্পূর্ণ গবেষণার অভিজ্ঞতা বেঞ্জামিন রেডফোর্ড ২০১১ সালে প্রকাশিত তার Tracking The Chupakabra: The Vampire Beast নামক বইয়ে লিপিবদ্ধ করেন।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় যে, পুয়ের্তো রিকোর প্রাণীটি আসলে কে ছিল? সেই সময় মুক্তিপ্রাপ্ত স্পিসিস সিনেমায় চুপাকাবরা ন্যায় এক কল্পনাতীত প্রাণীকে দেখানো হয়। এ থেকে ধারণা করা হয় চুপাকাবরা বর্ণনাকারী মেন্ডেলিন রাতের অন্ধকারে ঠিকঠাক চিহ্নিত করতে না পারায় একে সিনেমায় প্রদর্শিত প্রাণীর সাথে মিলিয়ে ফেলেন।

এভাবেই চুপাকাবরার গল্পটা শেষ হতে পারতো। কিন্তু তা আর হলো না! সাম্প্রতিক সময়ে টেক্সাসে আরো একবার সেই অদ্ভুত প্রাণীর দেখা মেলে। গত ২১শে মে রাত প্রায় দেড় টার দিকে অ্যামারিলো চিড়িয়াখানায় অবাধে বিচরণ করে দুই পায়ের প্রাণীটি। এতে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ আর কোন উপায় না পেয়ে তাদের অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম পেইজে সিসিটিভি ক্যামেরা থেকে সংগ্রহকৃত চুপাকাবরা সন্দেহে ধারণকৃত ছবিটি পোস্ট করেন এবং ক্যাপশনে সংযুক্ত করেন, “A mysterious figure has been spotted wandering Brackenridge Park on zoo security cameras. We are seeking the public’s help in identifying this strange creature,”

এছাড়াও ২০১৮ সালেও আমাদের পাশের দেশ ভারতের মণিপুর রাজ্যে চুপাকাবরা গুজব শোনা যায়। আর এভাবেই বারবার মানব সভ্যতার কাছে বারবার হাতছানি দিয়েও হারিয়ে যাচ্ছে “সে”।

জনপ্রিয় সংবাদ