Wednesday, February 28, 2024

ভুগলেও ভোক্তা সয়ে যান প্রতারণা

তারিখ:

চিকিৎসক মেহের নিগার নিশির বাস রাজধানীর কল্যাণপুরে। গত নভেম্বরে তিনি বাংলামটরের ‘এসএএস মার্বেল অ্যান্ড গ্রানাইট’ নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান থেকে ৪১ হাজার টাকার মার্বেল পাথর অর্ডার করেন। পুরো টাকা পরিশোধের পর কথা ছিল- তিন দিনের মধ্যে পণ্য পাবেন। এক মাস পরও পণ্য হাতে না পেয়ে ডা. নিশি ওই দোকানে যোগাযোগ করেন। পরে বিক্রেতা আরও ১০ দিন সময় চান। ওই সময় পার হওয়ার পরও পণ্য না পেয়ে ক্রেতা টাকা ফেরত চাইলে বিক্রেতা সে সময় পুরো টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানান। কারণ হিসেবে বিক্রেতা বলেন, এরই মধ্যে তার ক্রয়াদেশ অনুযায়ী কিছু পণ্য প্রস্তুত করা হয়েছে। ভুক্তভোগী ক্রেতা নিরুপায় হয়ে ঘটনার চার মাস পর জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করেন। পরে অধিদপ্তরের সহযোগিতায় অভিযোগের দু-এক দিনের মধ্যে সেই মার্বেল পাথর ডা. নিশি হাতে পান। এই তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে তিনি সমকালকে বলেন, ‘যদি ভোক্তা অধিদপ্তরে এ অভিযোগ করা না হতো, তাহলে হয়তো টাকা বা পণ্য কোনোটিই পেতাম না।’

গত এক যুগে ডা. নিশির মতো ৬৮ হাজার ৭০৩ জন ভোক্তা নানাভাবে প্রতারিত হয়ে অভিযোগ করেন ভোক্তা অধিদপ্তরে। প্রতিকারও পেয়েছেন এসব ভোক্তার অনেকে।

টাকা দিয়ে মানসম্পন্ন, নিরাপদ ও ভেজালমুক্ত পণ্য এবং সেবা পাওয়ার অধিকার রয়েছে ভোক্তার। একই সঙ্গে অধিকার রয়েছে পণ্যের উপাদান, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, বিক্রয়মূল্য, পণ্যের মান ও কার্যকারিতা বিষয়ে জানার। দেশের অধিকাংশ মানুষ এসব সেবা থেকে বঞ্চিত। প্রতিনিয়ত তারা হচ্ছে প্রতারিত। ভোক্তাদের সুরক্ষা দিতে ২০০৯ সালে সরকার প্রণয়ন করেছে ‘ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯’।

এ আইনের মূল উদ্দেশ্য হলো, ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ ও উন্নয়ন, ভোক্তা অধিকারবিরোধী কাজ প্রতিরোধ, অধিকার লঙ্ঘনজনিত বিরোধ নিষ্পত্তি, নিরাপদ পণ্য ও সঠিক সেবা নিশ্চিত করা, ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তাকে ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা, পণ্য ও সেবা ক্রয়ে প্রতারণা রোধ ও গণসচেতনতা তৈরি করা। প্রত্যন্ত অঞ্চলের ভোক্তারাও যাতে সহজে অভিযোগ জানাতে পারে, সে জন্য ‘ভোক্তা বাতায়ন’ শীর্ষক হটলাইন সেবা চালু আছে। যে কোনো স্থান থেকে ‘১৬১২১’ নম্বরে ফোন করে জানানো যাবে অভিযোগ।

সংশ্নিষ্টরা বলেন, প্রচার-প্রচারণার অভাবে মানুষ এ আইন ও এর সুফল সম্পর্কে জানে না। অন্যদিকে অভিযোগ এলেও অধিদপ্তরে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় ভোক্তাদের স্বার্থ সংরক্ষণের বিষয়টি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না।

১৯৮৩ সাল থেকে বিশ্বজুড়ে পালিত হয়ে আসছে ভোক্তা অধিকার দিবস। বিশ্বের ১১৫টি দেশে ২২০টি ভোক্তা অধিকার সংগঠন দিবসটি পালন করে থাকে। প্রতিবছরের মতো এবারও আজ মঙ্গলবার দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে বিশ্ব ভোক্তা অধিকার দিবস। এবারের প্রতিপাদ্য ‘ডিজিটাল আর্থিক ব্যবস্থায় ন্যায্যতা’।
দিবসটি উপলক্ষে কেন্দ্র থেকে উপজেলা পর্যায়ে ক্রোড়পত্র ও স্মরণিকা প্রকাশ, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন, ভোক্তাদের খুদে বার্তা পাঠানো, শোভাযাত্রা, আলোচনা সভা, ব্যানার-ফেস্টুন ও ডিজিটাল বোর্ড স্থাপন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

ভোক্তা অধিকার দিবস প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. রবিউল ইসলাম বলেন, ‘আগামীকাল (আজ) ভোক্তা অধিকার দিবস- একজন ভোক্তা হিসেবে এই তথ্য আমি জানি না। কারণ ঢাকার কোথাও এ বিষয়ে ফেস্টুন-ব্যানার বা কোনো প্রচারণা দেখিনি। এ বিষয়ে আইন প্রণয়ন একটি ভালো উদ্যোগ। ভোক্তারা এর সুফল কতটা পাচ্ছে, তা নিশ্চিত করতে হবে অধিদপ্তরকে। প্রতিষ্ঠানটির দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহি থাকতে হবে।’

ভোক্তা অধিকার নিশ্চিত করার জন্য গণসচেতনতা সৃষ্টির বিকল্প নেই উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘অনেকেই ভোক্তা আইন সম্পর্কে জানে না। সাধারণ ভোক্তাদের আইনের সুফল সম্পর্কে জানানো জরুরি। এ জন্য প্রচারণার বিকল্প নেই। সারা বছরই জনসচেতনতামূলক কর্মকাণ্ড থাকতে হবে। বছরে শুধু একবার দিবস পালন করলেই ভোক্তাদের অধিকার সংরক্ষণ করা যাবে না। তবে এটাও ঠিক, অনেকে প্রতারণার শিকার হয়েও ঝামেলায় যেতে চায় না। প্রতারণা সয়ে গেছে অনেকের। এ কারণে সরকারকে স্বপ্রণোদিত হয়ে ভোক্তাদের অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

কনসার্ন কনজুমার্স সোসাইটির (সিসিএস) নির্বাহী পরিচালক পলাশ মাহমুদ বলেন, ‘ভোক্তা অধিকার আইন প্রণয়ন হলেও প্রচারণার অভাবে অনেকেই আইনটির সুবিধা সম্পর্কে জানে না। গণসচেতনতায় আইনের প্রচার ও প্রতিকার বিষয়ে সরকার অর্থ বরাদ্দ দিলেও প্রচারণা নেই বললেই চলে। অধিদপ্তর থেকে একটি হটলাইন চালু করা হলেও এ সম্পর্কে ভোক্তারা জানেই না। হটলাইনটি কোনো প্রতিষ্ঠানের আওতায় না রেখে অধিদপ্তরের মাধ্যমে পরিচালনা করলে প্রতিদিন অনেক অভিযোগ আসবে।’

কনজুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সহসভাপতি এসএম নাজের হোসাইন বলেন, ‘প্রতি জেলায় মাত্র একজন কর্মকর্তা রয়েছেন। এত অল্প জনবল দিয়ে অধিকার রক্ষা সম্ভব নয়। এ ছাড়া বেশিরভাগ মানুষ জানেই না- তাদের অধিকার রক্ষায় এ রকম প্রতিষ্ঠান বা আইন আছে। অনেকে জেনেও সময়ক্ষেপণ বা জটিলতা এড়াতে প্রতিকার চাওয়া থেকে বিরত থাকে। এ জন্য সরকারকে ভোক্তা অধিকার সম্পর্কে প্রচারণা বাড়াতে হবে।

জনবল সংকটে ধুঁকছে ভোক্তা অধিদপ্তর :ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের অনেক সীমাবদ্ধতা রয়েছে বলে জানান প্রতিষ্ঠানটির মহাপরিচালক এএইচএম সফিকুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘প্রয়োজনের চেয়ে জনবল অনেক কম। ১৭ কোটি ভোক্তার অধিকার নিশ্চিত করতে জনবল মাত্র ২১৭। অধিদপ্তরের অনুকূলে নিজস্ব কোনো জমি বা অফিস ভবন নেই। নেই পর্যাপ্ত লজিস্টিক সাপোর্ট ও যানবাহন।’

তিনি বলেন, ‘ভোক্তারা সরাসরি, ডাকযোগে ও ই-মেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারে। তবে অনেকেই নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন না হওয়ার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত বা প্রতারিত হলেও অধিদপ্তরে অভিযোগ করছে না। ভোক্তাদের নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হতে হবে। তবে উপজেলা পর্যায়ে অধিদপ্তরের কার্যক্রম সম্প্রসারণে নিজস্ব কার্যালয় স্থাপন ও জনবল বাড়ানো জরুরি।’

অভিযোগ ও প্রতিকার :২০১০ সালের ৬ এপ্রিল থেকে বাজার পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি শুরু করে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। ওই সময় থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ৬৮ হাজার ৭০৩টি অভিযোগ করেছে ভুক্তভোগীরা। এর মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৫১ হাজার ৭৫৯টি অভিযোগ। অভিযোগ অনিষ্পন্ন রয়েছে ১৬ হাজার ৯৪৪টি।

এর মধ্যে অনলাইনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ই-কমার্স ও এফ-কমার্সের বিরুদ্ধে অভিযোগ সবচেয়ে বেশি। এ সংখ্যা ২৬ হাজার ৫৩৭। ২০১৮ সাল থেকে এসব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আসতে শুরু করে। মোবাইল ফোন অপারেটরগুলোর বিরুদ্ধে ২০১৭ সাল থেকে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অভিযোগ এসেছে তিন হাজার ৩৯২টি। তবে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতায় অভিযোগগুলো স্থগিত রয়েছে। অভিযোগের ভিত্তিতে সাত হাজার ২৮১টি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানকে পাঁচ কোটি ৯ লাখ ৪৩ হাজার ২০৮ টাকা জরিমানা করা হয়। এর মধ্যে ২৫ শতাংশ হিসাবে অভিযোগকারীদের দেওয়া হয় এক কোটি ২৫ লাখ ৪৭ হাজার ৯২৭ টাকা।

অভিযোগ ছাড়াও সংস্থাটি নিজস্ব উদ্যোগে বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালায়। এ পর্যন্ত ৪৯ হাজার ৯৬৮টি অভিযান চালিয়ে এক লাখ ২০ হাজার ১০২টি প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় আনা হয়। এসব প্রতিষ্ঠানকে ৮২ কোটি ৪৫ লাখ ৬৭ হাজার ৪২ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানের আওতায় আসা প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগ হলো দোকান, হোটেল-রেস্তোরাঁ, ওষুধের দোকান ও বিভিন্ন খুচরা বিক্রেতা।

বাজার অভিযান ও অভিযোগের নিষ্পত্তি করে প্রতিষ্ঠানটি এ পর্যন্ত সরকারের কোষাগারে ৮৬ কোটি ২৯ লাখ ৬২ হাজার ৩২৩ টাকা জমা দিয়েছে।

অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, কোনো ভোক্তার সেবা বা পণ্য কেনা, পণ্যের ওজন, পরিমাণ, বিক্রয়মূল্য, পণ্যের মান, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ, পণ্যের কার্যকারিতাসহ কোনো বিষয়ে প্রতারিত হলে তার প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ আছে। অপরাধের জন্য আইন অনুযায়ী জেল-জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।

অভিযোগ করবেন যেভাবে :ভুক্তভোগীকে অবশ্যই অধিদপ্তরে লিখিত অভিযোগ করতে হবে। ফ্যাক্স, ই-মেইল, ওয়েবসাইট বা অন্যান্য ইলেকট্রনিক মাধ্যমেও অভিযোগ জানানো যায়। অভিযোগের সঙ্গে অবশ্যই সেবা বা পণ্য কেনার রসিদ যুক্ত করতে হবে। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে (http://dncrp.portal.gov.bd) ‘জাতীয় ভোক্তা-অভিযোগ কেন্দ্র’ বক্স থেকে নির্ধারিত অভিযোগ ফরম ডাউনলোড করে নেওয়া যায়।

রাজধানীর কারওয়ান বাজারে (টিসিবি ভবন) ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এবং বিভাগ ও জেলা পর্যায়ে সংশ্নিষ্ট ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে অভিযোগ করা যায়। অভিযোগ প্রমাণের পর আর্থিক জরিমানা হলে অভিযোগকারী ওই টাকার ২৫ শতাংশ পায়। বাকি ৭৫ শতাংশ সরকারি কোষাগারে জমা হয়।

জনপ্রিয় সংবাদ